This site is under construction এই সাইটটির নির্মাণ কাজ চলছে

কুরআন সংকলনের ইতিহাস

যেহেতু নামায শুরু থেকেই মুসলমানদের ওপর ফরজ ছিল১ এবং কুরআন পাঠকে নামাযের একটি অপরিহার্য অংশ গণ্য করা হয়েছিল, তাই কুরআন নাযিল হওয়ার সাথে সাথেই মুসলমানদের মধ্যে কুরআন কন্ঠস্থ করার প্রক্রিয়াও জারী হয়ে গিয়েছিল। কুরআন যতটুকু নাযিল হয়ে যেতো মুসলমানরা ততটুকু কন্ঠস্থও করে ফেলতো।এভাবে নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কাতেবদের সাহায্যে খেজুর পাতা, হাঁড় ও পাথর খন্ডের ওপর কুরআন লেখার যে ব্যবস্থা করেছিলেন কেবলমাত্র তার ওপর কুরআনের হেফাযত নির্ভরশীল ছিল না বরং নাযিল হবার সাথে সাথেই শত শত থেকে হাজার হাজার এবং হাজার হাজার থেকে লাখো লাখো হৃদয়ে তার নকশা আঁকা হয়ে যেতো। এর মধ্যে একটি শব্দেরও হেরফের করার ক্ষমতা কোন শয়তানেরও ছিল না।

১. উল্লেখ্য, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের কয়েক বছর পর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরয হয়। কিন্তু সাধারণভাবে নামায ফরয ছিল প্রথম দিন থেকেই। ইসলামের জীবনের এমন একটি মুহূর্তও অতিক্রান্ত হয়নি যখন নামাজ ফরয হয়নি।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর আরবদেশে বেশ কিছু লোক 'মুরতাদ’ হয়ে গেলো। তাদের দমন করা এবং একদল মুসলমানের ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রোধ করার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতে হলো। এসব যুদ্ধে এমন অনেক সাহাবা শহীদ হয়ে গেলেন যাদের সমগ্র কুরআন কন্ঠস্থ ছিল। এ ঘটনায় হযরত উমরের (রাঃ) মনে চিন্তা জাগলো, কুরআনের হেফাযতের ব্যাপারে কেবলমাত্র একটি মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল থাকা সঙ্গত নয়। শুধু দিলের ওপর কুরআনের বাণী অঙ্কিত থাকলে হবে না তাকে কাগজের পাতায়ও সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। তদানীন্তন খলীফা হযরত আবু বকরের (রাঃ) কাছে তিনি বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করলেন। কিছুটা চিন্তা-ভাবনা করার পর তিনিও তাঁর সাথে একমত হলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাতেব (সেক্রেটারী) হযরত যায়েদকে (রাঃ) এ কাজে নিযুক্ত করলেন। এ জন্য যে পদ্ধতি নির্ধারণ করা হলো তা হলো এইঃ একদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব বিচ্ছিন্ন বস্তুর ওপর কুরআন লিখে গেছেন সেগুলো সংগ্রহ করা। অন্যদিকে সাহাবীদের মধ্যে যার যার কাছে কুরআনের যেসব বিচ্ছিন্ন অংশ লিখিত আছে তাদের কাছ থেকে সেগুলোও সংগ্রহ করা।২ এই সাথে কুরআনের হাফেযদের থেকেও সাহায্য নেয়া। এই তিনটি মাধ্যমেকে পূর্ণরূপে ব্যবহার করে নির্ভুল হবার ব্যাপারে শতকরা একশ’ ভাগ নিশ্চয়তা ও নিশ্চিন্ততা লাভ করার পর কুরআনের এক একটি হরফ, শব্দ ও বাক্য গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করা। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কুরআন মজীদের একটি নির্ভুল ও প্রামাণ্য সঙ্কলন তৈরি করে উম্মুল মু’মেনীন হযরত হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে রেখে দেয়া হলো। সবাইকে তার অনুলিপি করার অথবা তার সাথে যাচাই করে নিজের পাণ্ডুলিপি সংশোধন করে নেয়ার সাধারণ অনুমতি দেয়া হলো।
২. নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, রসূলের (সাঃ) জীবদ্দশায়ই বিভিন্ন সাহাবী কুরআন বা তার বিভিন্ন অংশ লিখে নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ), হযরত সালেম মাওলা হুযাইফা (রাঃ), হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ), হযরত হযরত মুআয ইবনে জাবাল (রাঃ), হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) এবং হযরত আবু যায়েদ কায়েস ইবনিস সাকান রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাম পাওয়া যায়।
একই ভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলার কথ্যভাষার মধ্যে যেমন পার্থক্য দেখা যায় আরবের বিভিন্ন এলাকার ও গোত্রের কথ্যভাষার মধ্যেও তেমনি পার্থক্য ছিল। মক্কার কুরাইশরা যে ভাষায় কথা বলতো কুরআন মজীদ সেই ভাষায় নাযিল হয়। কিন্তু প্রথম দিকে বিভন্ন এলাকা ও গোত্রের লোকদের তাদের নিজ নিজ উচ্চারণ ও বাকভঙ্গী অনুযায়ী তা পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কারন এভাবে পড়ায় অর্থের মধ্যে কোন পার্থক্য হতো না। কেবলমাত্র বাক্য তাদের জন্য একটু কোমল ও মোলায়েম হয়ে যেতো। কিন্তু ধীরে ধীরে ইসলাম বিস্তার লাভ করলো। আরববাসীরা নিজেদের মরুভূমির এলাকা পেরিয়ে দুনিয়ার একটি বিশাল বিস্তীর্ণ অংশ জয় করলো। অন্যান্য দেশের ও জাতির লোকেরা ইসলামের চতুঃসীমার মধ্যে প্রবেশ করতে লাগলো। আরব ও অনারবের ব্যাপকতর মিশ্রণে আরবী ভাষা প্রভাবিত হতে থাকলো। এ সময় আশঙ্কা দেখা দিল, এখনো যদি বিভিন্ন উচ্চারণ ও বাকরীতিতে কুরআন পড়ার অনুমতি অব্যাহত রাখা হয়, তাহলে এর ফলে নানা ধরনের ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। যেমন, এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে অপরিচিত পদ্ধতিতে কুরআন পড়তে শুনে সে সেচ্ছাকৃতভাবে কুরআনে বিকৃতি সাধন করেছে বলে তার সাথে বিরোধে ও সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। অথবা এই শাব্দিক পার্থক্য ধীরে ধীরে বাস্তব বিকৃতির দ্বার উন্মুক্ত করে দেবে। অথবা আরব অনারবের মিশ্রণের ফলে যেসব লোকের ভাষা বিকৃত হবে তারা নিজেদের বিকৃত ভাষা অনুযায়ী কুরআনের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে তার বাক সৌন্দর্যের বিকৃতি সাধন করবে। এ সমস্ত কারণে হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামদের সাথে পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, সমগ্র ইসলামী দুনিয়ায় একমাত্র হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে লিখিত কুরআন মজীদের নোস্‌খা (অনুলিপিই) চালু করা হবে। এ ছাড়া অন্যান্য সমস্ত উচ্চারণ ও বাকরীতিতে লিখিত নোস্‌খার প্রকাশ ও পাঠ নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হবে।
আজ যে কুরআন মজীদটি আমাদের হাতে আছে সেটি হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রাঃ)নোস্‌খার অনুলিপি। এই অনুলিপিটি হযরত উসমান (রাঃ) সরকারী ব্যবস্থাপনায় সারা দুনিয়ার দেশে দেশে পাঠিয়েছিলেন। বর্তমানেও দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে কুরআনের সেই প্রামান্য নোস্‌খাগুলো পাওয়া যায়। কুরআন মজীদ সঠিকভাবে সংরক্ষিত হবার ব্যাপারে যদি কারোর মনে সামান্যতমও সংশয় থাকে তাহলে মানসিক সংশয় দূর করার জন্য তিনি পশ্চিম আফ্রিকার গিয়ে সেখানকার কোন বই বিক্রতার দোকান থেকে এক খন্ড কুরআন মজীদ কিনে নিতে পারেন। তারপর সেখান থেকে চলে আসতে পারেন ইন্দোনেশিয়ার জাভায়। জাভার কোন হাফেযের মুখে কুরআনের পাঠ শুনে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে কেনা তাঁর হাতের নোসখাটির সাথে তা মিলিয়ে দেখতে পারেন। অতঃপর দুনিয়ার বড় বড় গ্রন্থাগারগুলোয় হযরত উসমানের (রাঃ) আমল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্তকার যতগুলো কুরআনের নোস্‌খা রক্ষিত আছে সবগুলোর সাথে সেটি মিলাতে পারেন। তিনি যদি তার মধ্যে কোন একটি হরফ নোক্‌তার পার্থক্য দেখতে পান তাহলে সারা দুনিয়াকে এই অভিনব আবিস্কারের খবরটি জানানো তাঁর অবশ্য কর্তব্য। কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে কিনা এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহকারী সন্দেহ করতে পারেন। কিন্তু যে কুরআনটি আমাদের হাতে আছে সেটি সামান্যতম হেরফের ও পরিবর্তন ছাড়াই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যে কুরআনটি নাযিল হয়েছিল এবং যেটি তিনি দুনিয়ার সামনে পেশ করেছিলেন তারই হুবহু অনুলিপি, এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশই নেই। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। এমন অকাট্য সাক্ষ্য –প্রমান সন্বলিত সত্য দুনিয়ার ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি পাওয়া যাবে না। এরপরও যদি কেউ এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন তাহলে বলতে হয়, দুনিয়ায় কোন কালে রোমান সাম্রাজ্য বলে কোন সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল এবং মোগল রাজবংশ কোন দিন ভারত শাসন করেছেন অথবা দুনিয়ায় নেপোলিয়ান নামক কোন ব্যক্তি ছিলেন – এ ব্যাপারেও তিনি অবশ্যই সন্দেহ পোষণ করবেন। এ ধরনের ঐতিহাসিক সত্য সন্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা জ্ঞানের নয়, বরং অজ্ঞতারই প্রমাণ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন